দ্বিতীয় প্রাণ

✒️....কলমওয়ালা: মোঃ রাগিব আল হাসান।

-----------------------------

মিতে ঢেরসগুলো চকচক করছে। সময়মত না তুললে, ঢেরসগুলোর বিচি বড় হয়ে যাবে। বাজারে ভালো দামে বিক্রি করা যাবে না। এমনিতেই জুলাই মাসের পরে ঢেরসের তেমন একটা দাম পাওয়া যাবে না। রহমত আলী সাহেব পেশায় বর্গা কৃষক। আগে অন্যের জমিতে কৃষি কাজ করতেন। এতে দিন হাজিরা পেতেন দৈনিক ছয়শত টাকা। রহমত আলীর একটা ছেলে। তার নাম খালিদ বিন ওয়ালিদ। ফুলপুর হাই-স্কুল এন্ড কলেজের উচ্চমাধ্যমিকে ২য় বর্ষে পড়ছে ছেলেটি। অসম্ভব মেধাবী ছেলে খালিদ। বাবাকে দিন মজুরের কাজে দেখতে ভালো লাগতো না তার। খালিদ জানে, শিক্ষা মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনে দেয়। দৈনিক ছয়শত টাকা বর্গা দিয়ে যে ফসল অন্যের জমিতে ফলানো হচ্ছে, সেটা যদি নিজের জমিতে ফলানো যেতো!! এই চিন্তা থেকেই দুজনে মিলে পরের জমিতে কাজ করে, সন্ধার পরে বাজারে নাইট গার্ডের ডিউটি করে ও মেলায় মুড়ি-পাপড় বিক্রি করে জমানো সর্বমোট বারো হাজার টাকা দিয়ে খালিদ ও তার বাবা একখন্ড চাষের জমি বর্গা নেয়া সেই জমিতে তাদের প্রথম চাষাবাদ শুরু। উচ্চফলনশীল ধান আর রবিশস্য দিয়ে তাদের বছর ভালোই পেরিয়ে যাচ্ছিলো। খালিদ পড়াশোনা জানায়, কোন সময়ে কোন সার দিতে হবে, কীটনাশক দিতে হবে, এসব বিষয় নিয়ে রহমত আলীর তেমন একটা সমস্যা হতো না। ছেলের সহযোগিতায় এখন রহমত আলীর তিনটি জমি। দুঃখ ঘুচে সুখের দিনগুলো মনে হয় ফেরত এসেছে। এরই মধ্যে জুলাই মাসে দেশে কি এক গন্ডগোল লেগে গেলো। কোটা বিরোধী আন্দোলনে দেশ উত্তাল। অনেক যায়গায় ছাত্র-জনতা মারা যাচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে খালিদের মন অনেক খারাপ। তার বয়সী অনেক ছেলেকে গুলি করে হত্যা করছে পুলিশ। যে পুলিশের সকলকে নিরাপত্তা দেয়ার কথা, সেই পুলিশ নির্বিচারে ছাত্র-জনতার উপড়ে গুলি চালাচ্ছে। এইটা সে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না।

আগস্ট ৪, ২০২৬ রোববার ভোরে রহমত আলী ফজরের নামাজ পড়ে কোরআন শরীফ পড়ছেন। খালিদ কাল রাতে অনেকক্ষন জেগে ছিলেন। সকালে উঠছে না দেখে, খালিদের মা ডেকে পাঠালেন। মাটির হাড়িতে গরম ভাত রান্না হচ্ছে। বাজার থেকে মাছ আনতে হবে। মাছ রান্না না হলে, দুপুরে খাবার খায় না খালিদ।"খালিদ, বাবা ওঠ। বাজার থেকে মাছ কিনে আন বাবা" "আজকে যা রান্না হচ্ছে, তাই রান্না করো" এই বলে, ওপাশ হয়ে আবার শুয়ে পড়লো খালিদ।

টিনের বেড়ার দরজায় অনেক ছিদ্র থাকায়, রোদের ছিটে এসে পড়েছে নামাজের পাটিতে। প্রতিদিনের চেয়ে আজকের রোদ মনে হয় একটু বেশিই লাল। মনে হচ্ছে, মুরগির তাজা রক্ত এসে পাটিতে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের অবস্থা নাকি ভালো না। রহমত আলী পড়াশোনা জানে না, তবে বাসার সামনের চায়ের দোকানে নিয়মিত বসে সংবাদ সে দেখে। প্রতিদিনের মতো আজকেও চায়ের দোকানে বসে সংবাদ শুনছে। কোটা আন্দোলন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা সহ বেশ কয়েক স্থানে ছাত্ররা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। পুলিশ তো জনগনেরই অংশ, তারা কেনো ছাত্রদের মারতে যাবে! এত মৃত্যুর খবর দেখে মনটা উদাস হয়ে উঠলো রহমত আলীর। বারবার চোখের সামনে খালিদের চেহারাটা ভেসে উঠছিলো। এসব ভাবতে ভাবতে সে কখন যে বাসায় এসে পৌছেছে, টেরই পায়নি। এসেই খালিদকে ডেকে উঠলো ওর বাবা।

মা ভেতরের ঘর থেকে উত্তর দিলো, "খালিদ নেই। বের হলো মাত্রা তুমি এক কাজ করো, খালিদের জন্য মাছ কিনে আনো, ছেলেটা মাছ ছাড়া দুপুরে ভাত খেতে চাইবে না।"

"ঠিক আছে, বাজারের ব্যাগটা দাও"খালিদ আর চন্দ্রাবতী পাশাপাশি বসে আছে। মেয়েটির আসল নাম চন্দ্রা। খালিদ নাম দিয়েছে চন্দ্রাবতী। দুজন দুজনকে অসম্ভব পছন্দ করে। মন খুলে কখনো বলা হয় নি, আমি তোমাকে ভালোবাসি। সকল ভালোবাসা ব্যাক্ত করার প্রয়োজন হয় না। মানুষ তো বাবা-মাকেও প্রচন্ড ভালোবাসে। কতজন বাবা-মাকে ভালোবাসি বলেছে!


খালিদ অনেকক্ষন চুপ করে থাকে বলে উঠলো,

"চন্দ্রা, আমাকে একটু ঢাকায় যেতে হবে।" "আমি চন্দ্রা না, চন্দ্রাবতী" অভিমানের সুরে বললো মেয়েটি।

অনেক গম্ভীর থাকার পরেও হেসে উঠলো খালিদ। "ঠিক আছে চন্দ্রাবতী। আমি একটু ঢাকা যাবো। আমাদের অনেক ভাই মারা যাচ্ছে। সরকার পতনের ডাক এসেছে। এবার না গেলে শহীদদের সাথে গাদ্দারী করা হবে।" কান্না করতে করতে চন্দ্রা বললো," তোমাকেই কেনো যেতে হবে? যদি তোমার কিছু হয়ে যায়? আমার কি হবে? "

খালিদ বড় বড় চোখে তাকালো। চন্দ্রাবতী হঠাৎ লাজ শরমের মাথা খেয়ে ফেললো কিনা! এসব ভাবছে মনে মনে।

"আমি তোমাকে যেতে দেবো না খালিদ"

"চন্দ্রাবতী, আমি ফুলপুর কলেজের সমন্বয়ক। আমার মুখের দিকে সকলে তাকিয়ে আছে। আমি না গেলে কেও লংমার্চে যাবে না। ভাই হত্যার প্রতিশোধ নেয়া হবে না।"

চন্দ্রাবতী কেদেই যাচ্ছে। কেনো যেনো মনে হচ্ছে, এ তার অন্তিমযাত্রা।

"শোন চন্দ্রাবতী, আমার বাবা-মায়ের আমি ছাড়া কেও নাই। আমি যদি লং মার্চ শেষে ফেরত না আসি। তাইলে আমার বাবা যেনো লাশের খোজে ঢাকায় না যায়। এখানেই যেনো গায়েবানা জানাযা করে, কবর দিয়ে দেয়।"

এই বলে খালিদ হনহন করে রওনা দেয়।

পেছন থেকে চন্দ্রা ডেকে ওঠে, "খালিদ শোনো, তোমার জামাটা ময়লা হয়ে গিয়েছে, আমি একটা সুন্দর শার্ট এনেছি তোমার জন্য এটা পড়ে যাও।"

"এখন সময় নেই চন্দ্রাবতী, বিজয়ী হয়ে ফিরে এলে, এই জামা পড়ে তোমার সামনে আসবো" এই বলে শার্টটি

হাতে নিয়ে হনহন করে রওনা দিলো খালিদ।

এই দৃশ্য দেখে, চন্দ্রাবতী নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না।

চাচা! বাসায় আছেন?

"কে?"

"চাচী, আমি চন্দ্রা"

"কি হয়েছে মা?"

"চাচী, খালিদ আজকে সকালে ঢাকা গিয়েছে। সকল ছাত্রজনতা মিলে লংমার্চ হবে। ও সবাইকে নিয়ে রওনা হয়ে

গেছে। আপনাদের জানাতে বলেছে"

এই বলে হু হু করে কেদে উঠলো চন্দ্রা।

চন্দ্রার কাছে এসে খালিদের মা মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললো,"কান্না করে না মা, আমার খালিদের কিচ্ছু হবে না। সকলের দোয়া ওর সাথে আছে।"


এই বলে আচলে মুখ ঢেকে চেপে কান্না করতে করতে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লো খালিদের মা। দূর থেকে সকল কথাই শুনলো খালিদের বাবা।

চন্দ্রা বাসার উঠোনে অনেক্ষন ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। কেনো যেনো মনে হচ্ছে, মাথার উপড়ের বটগাছ সরে গেছে। বিশাল আকাশে সে একা ভেসে বেড়াচ্ছে। কোন গন্তব্য নাই, কোন ঠিকানা নাই। এসব ভাবতে ভাবতে আকাশ থেকে একফোটা জল গড়িয়ে চন্দ্রার চোখে এসে পড়লো। চোখের জল আর বৃষ্টির জল একাকার হয়ে কপাল দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সৃষ্টিকর্তাও কি তার দুঃখে শরীক হলো? নইলে কেন এই জল?

খালিদের বাবা বাসার সামনের চায়ের দোকানের সামনে বসে আছে। সকলেই আগ্রহ ভরে টেলিভিশন দেখছে। শুধুমাত্র উৎকণ্ঠা খালিদের বাবার চোখে। লুকিয়ে লুকিয়ে কাদছেন রহমত আলী। বুকছেড়া ধন যে তার বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে! একটা করে মৃত্যুর সংবাদ টিভি স্কুলে ভেসে ওঠে, সাথে সাথে ডুকরে ডুকরে কেদে উঠেন রহমত আলী। তিনি জানেন না, এই লাশটা কি তার ছেলের না অন্যকারো।

৪ তারিখ পুরো দিন কোন খোজ নাই খালিদের। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে। ছেলে ঘরে ফেরেনি। ছেলের কাছে কোন মোবাইলও নাই যে, যোগাযোগ করবে। অভাবের সংসারে অনেকবার মোবাইল চেয়েও পায়নি খালিদ। আজকে অনেক আফসোস হচ্ছে রহমত আলীর, ছেলের ইচ্ছে মতো একটা মোবাইল তখন কিনে দিতেই পারতো। তাইলে অন্তত আজ ছেলেটার খোজ নিতে পারতো।

সারারাত দুঃশ্চিন্তা আর কান্নাকাটিতে পুরো রাত পোহালো। ফজরের নামাজের পর থেকে রহমত আলী চায়ের দোকানে বসে আছে। ভোরবেলা ডেকে এনেছে চায়ের দোকানীকে। একবার যদি ছেলেটাকে শেষ দেখা দেখতে পায়। সকাল গড়িয়ে দুপুর, ছেলের কোন খোজ নাই। না টিভিতে ছেলেকে দেখতে পাচ্ছে, না এলাকার কোন লোকের কাছে ছেলের খোজ আছে। দুপুরের পরে ঘোষনা এলো, সরকারের পতন হয়েছে। সবাই বিজয় মিছিল করছে। চারিদিকে কি আনন্দ! কিন্তু রহমত আলী তো আনন্দ করতে পারছে না। এর মাঝেও অনেক স্থানে বেওয়ারিশ লাশের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশ অনেক স্থানে স্তুপ করে লাশ জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এসব সংবাদ রহমত আলীকে ভিতর থেকে চুর্ন-বিচূর্ন করছে। বিকেলের দিকে ফুলপুর কলেজের ছাত্রদের গাড়ি ফিরে এলো। গাড়িতে ৩ টা লাশ। একজনের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে। বাকি দুজনের চেহারায় এত গুলি লেগেছে, চেহারা দেখে বুঝার উপায় নাই। রক্তমাখা গেঞ্জি দেখে বোঝা যাচ্ছে, একটা লাশ খালিদের। কলেজের ছাত্ররা লাশ নিয়ে খালিদদের বাড়িতে এসে রেখেছে। বীরের সম্মাননা দেয়া হচ্ছে খালিদকে। দেশকে মুক্ত করতে খালিদের আত্নত্যাগ সকলের মুখে মুখে। কিন্তু এত সুনাম, এত বীরত্বগাথা তো রহমত আলীর বুকের ঝড়কে থামাতে পারছে না। ঘরের মধ্যে খালিদের মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। চন্দ্রাবতী পাশে বসে অঝোরে কেদে যাচ্ছে। দেশ আজ স্বৈরাচার মুক্ত হলেও, স্থায়ী বিরহের কাছে বিষয়টি তুচ্ছ। মৃত্যুর সময় ছেলের চেহারা দেখতে না পাওয়ার বেদনা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে রহমত আলীকে।

বাদ মাগরিব জানাযা হবে। পুরো ফুলপুর বাসী জানাযায় এসেছে। সবার মুখে খালিদের বীরত্বের কথা। জানাযার সময়ে কান্নার রোল পড়ে গেলো। কবর দেয়া হয়ে গেলে, সকলে বাড়ি ফিরে গিয়েছে। চোখে ঘুম নাই রহমত আলীর। খালিদের মা বারবার মুর্ছা যাচ্ছে। রান্নাঘরে এখনো রান্না করা মাছ রয়েছে। দুদিনে পচে মাছি ভন ভন

করছে। মাছির ভনভিনানি দেখে, রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন রহমত আলী। মাছি দেখে তাড়িয়ে দিচ্ছেন মাছি গুলো।

"এই সরে যা, তোরা মাছ খেয়ে ফেললে আমার বাপধন কি খাবে?" এই বলে অঝোরে চোখের জল ছেড়ে দিলেন রহমত আলী। পেছন থেকে চন্দ্রা এসে রহমত আলীর কাধে হাত রাখলেন। পেছনে ঘুরে দাঁড়িয়ে দুজন মুখোমুখি হয়ে, হু হু করে কেদে উঠলেন।

"চাচি বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন। আজকে আমি থেকে যাই চাচা।

"ঠিক আছে মা"

ভোরের দিকে দরজায় ঠক ঠক শব্দ হলো। রাতে কাদতে কাদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে সবাই কেও জানে না।

দরজা খুলতেই রহমত আলী দেখলেন, সামনে খালিদ দাঁড়িয়ে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেন না রহমত আলী। গলা ভিজে কন্ঠ আটকে আসছে। চোখ ছলছল করছে। মুহুর্তেই চোখের সামনে জলের একটা পর্দা এসে চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো। ভয়ে কুকড়ে গেলেন রহমত আলী। চোখ মুছে আবার খালিদকে দেখতে পাবেন তো! নাকি সবই মরীচিকা! চোখ মুছে, খালিদের ক্লান্ত মুখটা আবার দেখতে পেলেন। খুশিতে গগন বিদারী চিৎকারে কেপে উঠলো সম্পূর্ন বাড়ি, "খালিদ বাবারে..........!!!!"

চিৎকার শুনে চন্দ্রা আর খালিদের মা দৌড়ে দরজার কাছে এলো। সবাই যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছে। রহমত আলী খালিদকে গতকাল বিকেলের ঘটনা খুলে বললেন। তার গেঞ্জি পড়া একটা ছেলেকে তিনি নিজহাতে কবর দিয়েছেন। খালিদ শুরু করলেন," ঢাকা পৌছানোর পড়ে আমরা যাত্রাবাড়ী পয়েন্ট এ প্রতিরোধ গড়ে তুলি। রাত ৩ টায় অকস্মাৎ একটা পুলিশের গাড়ি এসে আমাকে খোজো। আমার পাশে থাকা অপরিচিত একটা ছেলে, বললো ভাই আপনি পালান। আপনাকে ডিবি খুজতেছে। আমি পালাতে রাজি হইনা। ছেলেটি তাৎক্ষনাত আমার গেঞ্জি খুলে নিয়ে, নিজের গায়ে জড়িয়ে নেয়। পুলিশ এসে আমাদের কোন কথা জিজ্ঞেস না করে, ওই ছেলেকে আমাকে ভেবে তুলে নিয়ে চলে যায়। আমার কাছে চন্দ্রাবতীর দেয়া একটা শার্ট ছিলো। ওইটা পরে, পরেরদিন আমরা গনভবন ঘেরাও করি। আমাদের ভাড়া করা ট্রাক আগে চলে আসায় আমি গতকাল আসতে পারিনি।" খালিদ ফিরে এলে, পুরো এলাকায় রব পরে যায়। সবাই খুশি। সবচেয়ে বেশি খুশি চন্দ্রাবতী। কারন তার বীরপুরুষ তার দেয়া শার্ট পড়ে বীরের বেশে ফিরে এসেছে।

***